কৈলাস মানস - মলয় দেবনাথ

                                                                       



                                              


কৈলাস একটি লিঙ্গাকৃতি(
tetrahedronal)তুষারাবৃত পর্বত শিখরএর দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত শিখরটির উচ্চতা ২১,৮১৮ ফুট, শিখরটির তিব্বতী নাম কাং-রিং-পোছে কোথাও কোথাও পর্বতটিকেতিসরেবলেও অভিহিত করা হয় কৈলাস পর্বতমালা কাশ্মীর থেকে ভূটান পর্যন্ত প্রসারিত এই পর্বতমালা পূর্ব-পশ্চিমে লাদাখ পর্বতশ্রেণীর সমান্তরাল

কৈলাস পর্বতের বয়স প্রায় ৫৫ লক্ষ বছর এই পর্বতে ইয়োসিন(Eocene)যুগের পরবর্তীকালের কোনো শিলা পাওয়া যায় না কৈলাস কথাটির উৎপত্তি হয়েছে এইভাবেকৈল অর্থ সুখ আর আস অর্থাৎ আবাস শব্দ দুটি যুক্ত হয়ে কেলাস বা কৈলাস শব্দের সৃষ্টি হয়েছে কৈলাস সুপ্রাচীন হিন্দু জগতের দেবলোক হিমালয়ের পার্বত্য অধিবাসীরা কৈলাসকেকেলাসই বলে থাকে

এ অঞ্চলের আবহাওয়া মোটামুটি শীতল, শুষ্ক ও বায়ুপ্রবাহপূর্ণ জুন, জুলাই ও আগষ্ট মাসে এখানকার তাপমাত্রা সহনশীল অর্থাৎ ১১.৫ ডিগ্রী থেকে ১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে

তিব্বতী ভাষায় হ্রদকে বলে সো(tso) তিব্বতীদের কৈলাস পুরাণকাংরি কারছাকঅনুযায়ী মানস সরোবরের নামসোবাছো মাভাংঅর্থাৎ অজেয় মানস সরোবর বাল্মীকি রামায়নে বলা হয়েছে, কৈলাস পর্বতে ব্রহ্মার মন দ্বারা সৃষ্ট হ্রদ বলে সরোবরটির নাম হয়েছেমানসং সর মহাভারতে মানস সরোবরকে বিন্দুসর এবং জৈন সাহিত্যে পদ্ম হ্রদ বলে বর্ণনা করা হয়েছে শোনা যায় খুব জোরে বাতাস বইলে হ্রদের জলে সাগরের মত ঢেউ উঠতে থাকে সরোবরটির পরিধি প্রায় ৮৬.৫ কি.মি. এবং উচ্চতা ১৫,০৯৮ ফুট

মানস সরোবরের পশ্চিমে রয়েছে রাক্ষস তাল বা রাবণ হ্রদ রাবণ হ্রদকে বলে লাঙ্গক সো এই রাবণ হ্রদের উচ্চতা ১৫,০৫৬ ফুট লোককথা অনুযায়ী রাবণের ঘাম থেকে সৃষ্ট বলে তিব্বতীরা এর জলকে অপবিত্র ও পানের অযোগ্য বলে মনে করে হ্রদটি মানস সরোবরের থেকে কিছুটা ছোট এর মাঝে বৃক্ষলতাহীন প্রস্তরময় এক থেকে দেড় কি.মি লম্বা দুটো দ্বীপ রয়েছে একটালাচা টুঅপরটাটোপ সামরা

মানস সরোবরের দক্ষিণে মান্ধাতা দেবতার আবাস গুরলা মান্ধাতা(২৫,৩৪৮ ফুট) মানস-কৈলাস অঞ্চল চারটি বড় বড় নদীর উৎপত্তিস্থল তিব্বতী নামের নদীগুলিযেমনলাচেন খাম্বাবঅর্থাৎ হস্তী মুখাকৃতি নদী শতদ্রু এই সরোবরের পশ্চিম দিকে, ‘সিংগী খাম্বাববা সিংহ মুখাকৃতি নদী সিন্ধু উত্তরে, ‘টামচোক খাম্বাবঅথবা অশ্ব মুখাকৃতি নদী ব্রহ্মপুত্র পূর্ব দিকে এবংমাপচা খাম্বাবঅর্থাৎ ময়ূর মুখাকৃতি নদী কর্ণালী দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হচ্ছে

জেসুইট ধর্মযাজকদের সাহায্যে ফরাসী ভৌগলিক দ্য আনভিল ১৭৩৩ খ্রীষ্টাব্দে কৈলাসের প্রথম মানচিত্র অঙ্কন করেন তাঁর Carte Generale Du Thibet, Vol-1 এর শেষ দিকে মানস সরোবর ও রাক্ষসতাল হ্রদের কিছু বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় তবে ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে সর্বপ্রথম কৈলাসের ভৌগলিক তথ্য রচনা করেন মিলাম গ্রামের অধিবাসী পণ্ডিত নয়ন সিং রাওয়াত তার আগে অবশ্য ১৭১১ ও ১৭১৭ খ্রীষ্টাব্দে চিন সম্রাট কাং হি কয়েকজন লামাকে এইসব অঞ্চলে সমীক্ষা করতে পাঠিয়েছিলেন তাঁরা মানস সরোবর সহ তিব্বতের মানচিত্র অঙ্কন করেন ১৯৬২ খ্রীষ্টাব্দে R.G.Wilson ও আলমোড়ার ডেপুটি কমিশনার Hue Ratlez সস্ত্রীক কৈলাস পরিক্রমা করে অভিমত দেন যে কৈলাসের পূর্ব গিরিশিরা ধরে শিখর আরোহন সম্ভব কিন্তু আজ পর্যন্ত এই পর্বত শীর্ষে কেউ পদার্পণ করেছেন বলে জানা যায় নি কৈলাস হিন্দু তো বটেই তিব্বতীদের কাছেও পরম পবিত্র শিখর যতদূর জানা যায় তিব্বতীদের ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত লাগতে পারে বলে এই পর্বতে কোনো অভিযান সংঘটিত করার অনুমতি দেওয়া হয় না

অন্যদিকে হিন্দুদের পৌরাণিক গ্রন্থসমূহে বিশেষ করে স্কন্দপুরাণে কৈলাস-মানস সরোবরের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে সুন্দর বর্ণনা আছে ঋষি দত্তাত্রেয় হিমালয় ভ্রমণের পরে বারাণসীর রাজা ধন্বন্তরীর কাছে তার সৌন্দর্য সম্বন্ধে ভূয়সী প্রশংসা করেন বিশেষত দেবাদিদেব শিবের বাসস্থান সম্পর্কে তিনি ছিলেন অধিক উচ্ছ্বসিত
ভারতবর্ষ থেকে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার জন্য কাশ্মীর থেকে কুমায়ুন পর্যন্ত পরিচিত দশটি পথ রয়েছে এছাড়াও ভারতের উত্তরতম বিন্দু কারাকোরাম গিরিবর্ত্ম(১৮,২৯০ ফুট) থেকে শুরু করে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত বহু অপ্রচলিত পথে ভারতের মানুষেরা মানসখণ্ড তথা তিব্বতে যাতায়াত করত বর্তমানে লিপুলেখ গিরিবর্ত্ম(১৬,৭৫০ ফুট) কৈলাস-মানস সরোবরে তীর্থ যাত্রার জন্য ও শিপকি লা(১৫,৪০৪ ফুট)[মেষ পালকদের ভাষায় পিমিগ লা] পথে সীমিত কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য চালু হয়েছে সিকিমের নাথুলা হয়ে নতুন করে পণ্যদ্রব্যাদি কেনাবেচার কথাও চলছে ভারত থেকে কৈলাস তীর্থে যাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মোটামুটি নিরাপদ পথ হল লিপুলেখ গিরিবর্ত্মবর্তমানে ধারচুলা-তাওয়াঘাট হয়ে পুরানো হাঁটা পথে গালার নীচে কালী নদীর তীরে মাঙ্গতি পর্যন্ত গাড়ি চলাচল করলেও ভারতীয় ভূখণ্ডে ৬৪ কি.মি এবং তিব্বতের মাটিতে আরও ১৯ কি.মি হাঁটতে হয় অথচ লাদাখের মধ্যে দিয়ে মানস-কৈলাস দর্শনে যাওয়া সম্ভব হলে লে শহর থেকে তিনদিনের গাড়িপথে কৈলাসের নিচে বরগা পৌঁছানো যেত কিন্তু ভারত-চিন দু দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাবে সে পথ আজও রুদ্ধ বাধ্য হয়ে হাঁটতে অক্ষম মানুষদের অনেক বেশি টাকা খরচা করে কাঠমাণ্ডু হয়ে কৈলাস মানস তীর্থে যেতে হয়

                                                     
তথ্য সূত্র
                                                   
বইকুমায়ুন হিমালয়
                               

Comments

Popular posts from this blog

আলোঝাপসা - শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

লক্ষ্মণের নরকদর্শন - নবনীতা দেবসেন

মন্দিরে মৃত্যুভয় - মলয় দেবনাথ