আলোঝাপসা - শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়
এক
শৈবাল
পিছনে তাকায়। শান্তশিষ্ট
মফস্সল। ইশকুল যাচ্ছে একটা
ছেলে। শান্তিনিকেতনী ঝোলাব্যাগের
কাঁধের কাছে গিঁট দিয়ে ঝুলটা
কম করে নেওয়া,
যাতে
জোরপায়ে হাঁটার সময়ে ব্যাগ
আয়ত্তে রাখা যায়। পড়াশুনোয়
আহামরি না হলেও পাঁচ থেকে দশের
মধ্যেই থাকত রোল,
প্রতি
ক্লাসে। ছাত্রাণাং অধ্যয়নং
তপঃ,
তড়িৎবাবু
বলতেন। টিউশনি আর মুগুরভাঁজা,
কাজ
বলতে এই ছিল তড়িৎবাবুর।
নিয়মনিষ্ঠ,
অকৃতদার,
সুঠাম
সেই মানুষটার কথা মনে পড়ে
শৈবালের। মনে পড়ে যায় ওর দিদির
রোজ সন্ধেতে নিয়ম করে হারমোনিয়াম
নিয়ে বসা,
আর
সারেগামা সেধে নিয়েই ‘সেই
গান,
কেন
আমি পারি না শোনাতে’ শুরু করা।
আর আষাঢ়ের অনন্ত বিকেল শেষে
ঝুঁঝরো আঁধারে যখন কোচিং পড়ে
ফেরে মধুজা,
একা
বা কয়েকজন,
ও
বাড়ির রোয়াকে বসে থাকে। ওই
অন্ধকার হয়ে আসা বিকেলে,
চোখের
দৃষ্টি যখন বেশি দূর ঠাহর করতে
পারে না,
মধুজার
সেই সবজে-ঘিয়ে
বা আলতা-রঙা
সালোয়ারের ইশারা,
ওই
সামান্য সামনে ঝুঁকে হাঁটার
ভঙ্গি।
মনের
পর্দায় ভেসে ওঠে শৈবালের,
একটার
পর একটা,
এরকম
ছবি দেখলে। এরকম ছবি ইন্টারনেটে
ঘোরাফেরা করে হামেশাই। একজন
ফেসবুকে পোস্ট করল,
তো
আরেকজন সেখান থেকে হোয়াটসঅ্যাপে,
কেউ
আবার সেটাকে মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে
দিল। আঁকা ছবি অথবা অত্যন্ত
দক্ষতায় সম্পাদিত ফোটো। আলোয়
মোড়া কোনও শহর,
উৎসবের
সন্ধে। এক পশলা ঝেঁপে বৃষ্টি
হয়ে গেছে। সেই হঠাৎ বৃষ্টিতে
শুনশান হয়েই রাস্তায় আবার
মানুষের ঢল নামবে নামবে করছে।
অথবা কোনও ছবিতে মানুষ তেমন
নেই হয়তো। একটা ট্রাম আসছে,
ইলেকট্রিকের
তার আর ট্রামের হ্যাঙার।
বৃষ্টি সবে ধরল। একঝাঁক পাখি
তারে বসল এসে। একটি দুটি মানুষ
ফিরে যাচ্ছে। বর্ষার বিকেলের
শেষ আলোয়। যেন আর তিন সেকেন্ড
পরেই পুরোপুরি সন্ধে নেমে সব
আঁধার হয়ে যাবে। সবরকম উজ্জ্বল
রঙের বাড়াবাড়ি সমাহার,
আশ্চর্য
ঝলমলে। আর পুরো ছবিটায় যেন
এক ফোঁটা জল পড়ে গেছে রঙগুলো
শুকনোর মুখেই। অথবা তোলার
মুহূর্তে একফোঁটা জল লেন্সে
পড়ে ঝাপসা করে দিয়েছে ফোটোটাকে।
শৈবাল
বুঁদ হয়ে যায়।
শৈবাল পিছনে তাকায়। শান্তশিষ্ট মফস্সল। ইশকুল যাচ্ছে একটা ছেলে। শান্তিনিকেতনী ঝোলাব্যাগের কাঁধের কাছে গিঁট দিয়ে ঝুলটা কম করে নেওয়া, যাতে জোরপায়ে হাঁটার সময়ে ব্যাগ আয়ত্তে রাখা যায়। পড়াশুনোয় আহামরি না হলেও পাঁচ থেকে দশের মধ্যেই থাকত রোল, প্রতি ক্লাসে। ছাত্রাণাং অধ্যয়নং তপঃ, তড়িৎবাবু বলতেন। টিউশনি আর মুগুরভাঁজা, কাজ বলতে এই ছিল তড়িৎবাবুর। নিয়মনিষ্ঠ, অকৃতদার, সুঠাম সেই মানুষটার কথা মনে পড়ে শৈবালের। মনে পড়ে যায় ওর দিদির রোজ সন্ধেতে নিয়ম করে হারমোনিয়াম নিয়ে বসা, আর সারেগামা সেধে নিয়েই ‘সেই গান, কেন আমি পারি না শোনাতে’ শুরু করা। আর আষাঢ়ের অনন্ত বিকেল শেষে ঝুঁঝরো আঁধারে যখন কোচিং পড়ে ফেরে মধুজা, একা বা কয়েকজন, ও বাড়ির রোয়াকে বসে থাকে। ওই অন্ধকার হয়ে আসা বিকেলে, চোখের দৃষ্টি যখন বেশি দূর ঠাহর করতে পারে না, মধুজার সেই সবজে-ঘিয়ে বা আলতা-রঙা সালোয়ারের ইশারা, ওই সামান্য সামনে ঝুঁকে হাঁটার ভঙ্গি।
দুই
শ্রীতড়িৎকান্তি
ভট্টাচার্য। মাঝেরপাড়ার
ভট্টাচার্য পরিবারের সেজো
তরফের সর্বকনিষ্ঠ ছেলে। অন্য
অন্য তরফ আর ওপর-নীচে
নিয়ে দাদা-দিদির
সংখ্যাটা নেহাৎ ফেলনা নয়।
একসময়ের ছোটখাটো জমিদার
ভট্টাচার্যরা নাকি কাজ তেমন
কিছু না করলেও আগামী তিন প্রজন্ম
হেসেখেলে কেটে যাবে।
এহেন
পরিবারে জন্মে তড়িৎকান্তি
পড়াশুনো করলেন অনেক। সঙ্গে
খুব ভাঁজলেন ডাম্বেল-মুগুর।
এবং শেষমেশ ঝুঁকলেন চিত্রকলার
জগতে। কলকাতার আর্টস্কুলে
ভরতি হলেন তড়িৎকান্তি ভট্টাচার্য।
সেখানে তিনি সেসময়ের
বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলা কোনও
এক মুভমেন্ট তথা ধারায়
ফুল্ল-কুসুমিত
হয়ে অনেক দূর এগোন। তারপর ফিরে
আসেন একদিন। শৈবালদের ইশকুলে
চাকরিতে ঢোকেন,
অঙ্কন
শিক্ষক হিসেবে। এবং নিজের
আগ্রহে বাড়িতে ইতিহাস পড়ানো
শুরু করেন,
একটু
উঁচু ক্লাসের ছেলেদের। ছাত্র
হিসেবে তিনি বরাবরের উজ্জ্বল।
অনেকগুলি বিষয় ছিল তাঁর গভীর
আয়ত্তে। কিন্তু ইতিহাস ওঁর
প্যাশন বললেও কম বলা হয়।
পাশাপাশি চলে মুগুর ভাঁজাও।
সেখানেও তালিম নিতে জড়ো হয়
এক এক করে কমবয়সী গুটিকয় ছেলে।
ক্রমে
ইশকুলের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে
পাকাপাকিভাবে টিউশনি আর
শরীরচর্চা। চাকরি ছাড়তে
দ্বিধার প্রশ্নই নেই,
বাধা
দেবারও নেই কেউ। একদিকে তাঁদের
অগাধ পৈতৃক সম্পত্তি,
তার
ওপর তড়িৎকান্তি মহাশয় কারও
দার পরিগ্রহ করেননি। বয়স পার
করলেন প্রায় একচল্লিশ। তিনি
নিজের থাকার ব্যবস্থা করে
নিয়েছেন বারবাড়িতে। এককালে
সেটা ছিল সদর ঘর। বাইরের লোকলশকর
সব এই ঘরেই আসত,
বসত,
মজলিশ
জমাত। সে অযোধ্যা,
সে
রাম না থাকলেও সেদিনের সদরঘরখানি
রয়ে গেছে। বড়সড় ঘর,
সংলগ্ন
বাথরুম,
ছাদে
ওঠার সিঁড়ি,
বাইরের
দিকে বারান্দা। ওই বারান্দায়
বসে সকালের চা খেতে খেতে খবরের
কাগজে চোখ বোলানো যে কত আমেজের
তা সবার জানার কথা নয়। ঘরের
পেছনদিকে বারোয়ারি উঠোন।
উঠোন পেরিয়ে অন্দরমহল। উঠোনের
একটা ছোট অংশ তড়িৎকান্তি নিজ
খরচে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে নিয়েছেন।
কেউ আপত্তি করেনি তেমন। ঘেরা
উঠোনে উনি একা এবং ছেলেপিলেদের
নিয়ে শরীরচর্চা করে থাকেন।
ক্লাস
এইটে উঠলে শৈবালকে তড়িৎবাবুর
কাছে পড়ার জন্য পেশ করে ওর
বাবা। সপ্তায় তিনদিন,
সকালে
ঠিক সাতটায় শুরু হয় পড়ানো,
নটা
পর্যন্ত। প্রায় ব্রাহ্মমুহূর্তে
ঘুম থেকে ওঠা তড়িতের অভ্যাস।
প্রাতকৃত্যাদির পরে শরীরচর্চা,
একঘণ্টার
বেশি। তারপর ভোরের আলো যখন
সামনের বারান্দায় এসে পড়ে,
আর
তড়িৎকান্তি নিজের হাতে বানানো
এক গ্লাস দুধ মেশানো ঈষৎ ঘন
চা তারিয়ে তারিয়ে চুমুক দেন
তখনই একটা দুটো করে ছেলে আসে,
পড়তে।
পড়ানোর পর্ব শেষে শুরু হয়
মুগুর-ডাম্বেল
প্রশিক্ষণ। তড়িৎকান্তি
প্যাঁচ-পয়জারগুলো
দেখিয়ে দেন। বলেনও,
যা
কিছু বলার। দ্বিপ্রাহরিক
স্নান এবং স্বপাক নিরামিষ
আহারশেষে তিনি কোনওদিন বাড়িতে,
না
হয় কাছের লাইব্রেরিতে গিয়ে
পড়েন। রোজের কাগজ এবং কিছু
নির্দিষ্ট বিষয়ে লিখিত বইয়ের
জগতে উনি মগ্ন হয়ে যান দ্রুতই।
বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে তড়িৎকান্তি
চলে যেতেন গির্জার মাঠ।
ওখানে
ওঁর কিছু ছোট বন্ধু আছে,
বয়সে
কেউ আট দশের বেশি নয়। তাদের
সঙ্গে গল্পে হাসিতে বিকেলটা
বেশ কাটে। আড্ডার পাশে পাশে
চলে পল্লবগ্রাহিতা। তড়িৎবাবু
নিজে,
এবং
বাকিরাও খড়কুটো,
শুকনো
হয়ে যাওয়া গাছের পাতা,
ডাল
এইসব এক জায়গায় নিয়ে জড়ো করে।
বিকেল যখন শেষ হয়ে আসে,
তড়িৎকান্তি
জামার পকেট থেকে দেশলাই আর
ছোট বাতি বের করে হাওয়া আড়াল
করে প্রথমে বাতিটা,
তার
পরে খড়কুটো সব জ্বেলে দেন।
ছোট্ট অগ্নিকুণ্ডে বাতিটাকে
আহুতি দিয়ে উনি সেদিকে চেয়ে
থাকেন খানিক,
অপলক।
সন্ধে
সাতটা থেকে ন-টা
আবার পড়ানো। এগারো বারো ক্লাসের।
নিজের নৈশাহারের আয়োজন সেরে
তড়িৎকান্তি কখনো ক্যানভাসে
আঁচড় কাটেন। কোনওদিন হয়তো
ক্যাসেট চালান। ভারতীয় বিশুদ্ধ
মার্গসংগীত শোনা ওঁর অনেকদিনের
শখ। নিয়ম করে রাত দশটা থেকে
এগারোটা পনেরো বা সাড়ে এগারোটা।
তারপর ঘুম।
তড়িৎকান্তি
ভট্টাচার্য মহাশয়ের সামগ্রিক
পাণ্ডিত্য,
শিক্ষণ-কৌশল,
গমগমে
কণ্ঠ,
স্পষ্ট
উচ্চারণে থেমে থেমে কথা বলা,
বিশাল
লতায় পাতায় জড়ানো পরিবারে
থেকেও একক,
জীবননীতি,
শরীরচর্চা
সব কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে শৈবালকে
টানল। ক্রমে আষ্টেপৃষ্ঠে
জড়ালো। পড়ানোর সময় ছাড়াও ওর
জন্য তড়িৎবাবুর ঘরের দরজা
হয়ে গেল অবারিত। অন্যান্য
বিষয়ে আলাদা টিউশন-মাস্টারমশাই
থাকলেও তড়িৎবাবুর কাছে একবার
জেনে নেওয়া অভ্যাসে পরিণত হল
ক্রমে। ইশকুল-কোচিং
বাদে বাকি সময়ের বেশিটাই কাটতে
শুরু হল তড়িৎবাবুর সঙ্গে।
তিন
মাতৃবিয়োগ
বোঝার বয়স হয়নি তখন শৈবালের,
কিন্তু
ওর দিদি শিবরঞ্জনীর হয়েছিল।
ওর বাবা শিবনাথ শখ করে এই নাম
রেখেছিলেন। নিজের নামে মিলিয়ে
বলে নয়,
শৈবাল-শিবরঞ্জনীর
মায়ের গানের গলা ছিল দারুণ।
তিনি শিবরঞ্জনী রাগের গান
অবলীলায় নিখুঁত গাইতে পারতেন,
মন্ত্রমুগ্ধ
হয়ে যেতেন সকলে। সুখের সংসারে
কখন যে অসুখ ঢুকে পড়ে,
কে
আর চোখে দেখতে পায় তাকে। যক্ষায়
আক্রান্ত হন ওদের মা,
নীহারিকাদেবী।
বত্রিশ বছর বয়সেই তিনি স্বামী
এবং দেড় বছরের ছেলে আর ন-বছরের
মেয়েকে রেখে জীবনের মায়া ত্যাগ
করেন।
সংসারের
অলিখিত নিয়মে শোক পুরনো হয়,
তার
ধার কমে। মাঝখান দিয়ে চার
চারটে বছর চলে গেছে। শিবনাথের
চাকরিতে বাইরে ঘোরা ছিলই,
মাঝে
স্থগিত ছিল বছর তিনেক মতো,
এই
সব ঘটনার জন্য। আবার শুরু হয়,
মাসের
মধ্যে অনেকগুলো দিন বাইরে
কেটে যায়। সে সময় ওদের ছোট
মাসি,
কমলিকা
এসে থাকে। দিদিমাও আসে ছোটমাসির
সঙ্গে কোনও কোনও বার,
তবে
টানা থাকতে পারে না। দিদিমার
কাছেই তো চলে গেছিল ওরা,
মা
চলে যাবার পর। ওখানেই,
মামার
বাড়িতেই,
মামা
যদিও নেই ওদের,
এই
তিন সাড়ে তিন বছর থেকেছে,
বড়
হয়েছে ওরা। ওদের বাবা রোজ অফিস
ফেরত গিয়ে দেখে এসেছে ওদের,
একটা
দিনও এর অন্যথা হয়নি। তার পর
শিবরঞ্জনীই একটু যেন জেদ করে
নিজের বাড়িতে ফেরে,
বাবার
কাছে ঝুলোঝুলি করে। ছোটমাসি
বিবাহযোগ্যা,
দেখাশুনো
চলছিল। সেই মেয়েকে বাচ্চা
দেখভালে পাঠাতে তেমন রাজি
হতে পারত না শৈবালের দিদিমা।
আশঙ্কা,
শেষমেশ
ছোটর জন্য আসা সম্বন্ধে না
কিছু ঘোঁট পাকে।
আর
পাকেও,
আশঙ্কাকে
সত্যি করে। এক জায়গায় বিয়ের
কথা বেশ এগিয়েছিল,
সব
দিক থেকে যাকে বলে পালটি ঘর।
সেই অবস্থায় শৈবালের বাবার
বাইরে ট্যুর শিডিউল,
ছোটমাসির
এসে শৈবালদের সঙ্গে থাকা। যে
পরিবারে সম্বন্ধ-কথা
হচ্ছিল তাদের কেউ ছোটমাসিকে
দেখে কোনওদিন,
শৈবালদের
পাড়ায়,
শৈবাল
আর ওর দিদির সঙ্গে,
বিকেলে
একটু বেড়িয়ে ফেরার পথে। দিকে
দিকে সেই খবর রটে গেল ক্রমে।
সম্বন্ধটা
নাকচ হয়ে যায়। শৈবালের ছোটমাসির
আত্মসম্মান বোধ ছিল প্রখর।
এর আগেও ওর এক-দুবার
কথাবার্তা বিশেষ এগোয়নি,
সেসব
ও পাত্তা দেয়নি অত। কিন্তু
এইবার রাস্তায় সন্তানবৎ
ছেলেমেয়ে নিয়ে হেঁটে বেড়ানোর
কারণে সম্বন্ধ নাকচ হওয়াটা
বেশ অপমানের,
সর্বসমক্ষে
অপমানের। যে বিকেলে বেড়ানোর
কথা ঢি ঢি হয়ে এতকিছু,
তার
পরের দুপুরে শৈবালের বাবা
ফিরে আসে ট্যুর থেকে। ফিরেই
ছেলে মেয়েকে নিয়ে খুব হুল্লোড়
হয় এক প্রস্থ। চান খাওয়া মিটল।
কিন্তু শিবনাথের শ্যালিকা
কেন এত চুপচাপ!
কাছে
ডেকে বসিয়ে কী হয়েছে জিজ্ঞেস
করতে পা ঘষে ঘষে আসে,
ধরা
গলায় ‘কিছু না’ বলতে থাকে এবং
চোখ ভরতে থাকে জলে। যখন তা গাল
বেয়ে গড়ায় এবং সে দ্রুত মুছে
নেয়,
তখন
জামাইবাবু ওর মুখ থুতনি ধরে
তুলে আবারও প্রশ্ন করে,
শুনি
কী হয়েছে,
তখন
আর নিজেকে সামলাতে পারে না
কমলিকা। ফুঁপিয়ে বড় জামাইবাবুর
বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সে যখন,
তখন
শৈবাল খুব সাদা চোখে সেখানেই,
আর
শিবরঞ্জনী প্রবল অস্বস্তি
নিয়ে ভাইকে একপ্রকার টেনে সে
ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসে।
শিবনাথ কোন মেয়ের চোখের ভাষা
পড়বে?
নিজের,
না
বিগত স্ত্রীর ছোট্ট বোনটার?
দুজনেই
যে বড় হয়ে গেল!
এবার
যা হবার,
সেটাই
হল। ওই ঘটনার পাঁচ মাসের মাথায়
শৈবাল এবং শিবরঞ্জনী তাদের
একান্ত আদরের ছোটমাসিকে পেল
পরিবারে,
মা
হিসেবে। শিবনাথ আবার মধুচন্দ্রিমা
যাপনের উদ্যোগ নিলেন। আগেরবার
হয়েছিল পুরী,
এবার
বিশাখাপত্তনম। হোটেলের
ফ্যামিলি রুম রিজার্ভ করলেন,
যেখানে
দুটি বাচ্চা পর্যন্ত থাকতে
পারবে। আর তার বছর খানেক বাদে
শৈবালদের পরিবারে আগমন হয়
আরও একটি ফুটফুটে ছেলের। সেদিন
শৈবাল আনন্দে খুব নেচেছিল।
শিবরঞ্জনী নিজে জানে না,
কতটা
আনন্দ ও পেয়েছিল।
শিবরঞ্জনী
ছোটমাসি ডাক পালটাতে পারেনি,
ওকে
জোরও করেনি কেউ। তবে শৈবাল
মা ডাকে। মা ডাকে প্রবালও,
শিবনাথ-কমলিকার
পুত্র প্রবাল। কমলিকার স্নেহে
কিছু কার্পণ্য পরিলক্ষিত হয়
না তিন সন্তানের মধ্যে। কিন্তু
শিবরঞ্জনীর বয়সটাই এমন,
এতকিছুর
জেরে,
সে
সংসারে নিজেকে ক্রমশ অপ্রয়োজনীয়,
অপাংক্তেয়
ভাবতে শুরু করে। পড়ে,
ইশকুল
কোচিং যায়। গান শেখার শুরু
ছোট থেকেই। নিজের জগতে থাকে
সে। গান নিয়ে,
পড়াশুনো
নিয়ে।
ক্রমে
চলে যায় আট আটটি বসন্ত হেমন্ত।
চার
ভাই
প্রবালকে সকালের ইশকুলে দিয়ে
আসে দিদি শিবরঞ্জনী,
ও
থ্রি-তে
এখন। নিয়ে আসে শৈবাল। দিদি
সারা দিন নিজের নানা কাজেকর্মে
ব্যস্ত। কখনো কোনওদিন ছোটমাসির
কাছে নতুন কোনও রান্নার পদ
শিখে রেঁধে ফেলছেও। সঙ্গীত
নিয়ে গবেষণা করছে ও,
রবীন্দ্রভারতী
থেকে। সন্ধ্যায় গান নিয়ে বসা,
গান
শেখানো,
প্রবালের
হোমটাস্ক করানো এইসব নিয়েই
আছে ও।
ক্লাস
নাইন হল শৈবালের,
চাপ
বাড়ছে পড়ার। ওর এখন সেই বয়স,
যে
বয়সে ছেলেরা দ্রুত প্রভাবিত
হয় অন্যের দ্বারা,
দ্রুত
প্রেমেও পড়ে। তড়িৎকান্তি তো
আগেই প্রভাব বিস্তার করেছিল,
এবার
শৈবাল মোহিত হয় মধুজার আকর্ষণে।
শিবনাথ
চাকরিতে আরও সিনিয়র পদে উঠেছেন।
এখন তাঁর আগের মত অত ট্যুর
থাকে না। কমলিকা কিঞ্চিৎ
পৃথুলা হয়েছেন। গুছিয়ে সংসার
করলেও শিবরঞ্জনীর সঙ্গে কোথায়
এক অদৃশ্য কাঁটা আজও রয়ে গেল।
না তিনি এগোতে পারেন,
না
সে মেয়ে পারে আগল খুলতে। কমলিকা
মেনে নিয়েছেন। বাইরে থেকে
দেখলে তাঁর ব্যক্তিত্বের
সঙ্গে সব কিছু আশ্চর্যভাবে
মিলেমিশে গেছে।
পাঁচ
মাধ্যমিক
খুব ভালোভাবে উতরোল শৈবালের।
মাধ্যমিকে ভালো করলেই সবাই
বিজ্ঞান নিয়ে পড়ে। কিন্তু
শৈবাল আর্টস নিল,
পরে
ইতিহাস নিয়ে এগোবে ও। মিউজিয়োলজি
নিয়ে পড়বে ও।
দুদিন
হল বিসর্জন হয়েছে। এবার
দুর্গাপুজো একটু দেরিতে হল,
প্রায়
অক্টোবরের শেষ। ঠান্ডা পড়েছে
হালকা। অবশ্য পুজোর দুদিন,
অষ্টমী
নবমী,
দুদিনই
সন্ধেয় হুড়মুড় করে বৃষ্টি হল
একচোট করে। ভিড় ছত্রভঙ্গ,
আবার
নিমেষে ভিড়ে ভিড়। সেই বৃষ্টির
জেরেও চারপাশ একটু কেমন ঠাণ্ডা
ঠাণ্ডা।
রাত
এগারোটা হবে। শৈবাল ছাদে ওর
নিজস্ব কোণে এসে আড়াল করে বসে
সিগারেটটা ধরিয়ে এসবই ভাবছিল।
খেয়াল করেনি ওর দিদি কখন এসে
দাঁড়িয়েছে পিছনে। খেয়াল হতেই
তাড়াতাড়ি সদ্য ছাড়া ধোঁয়া
সরাবে না সিগারেটটা লুকোবে
ভেবে ওর বুক ঢিবঢিব হবে কি,
তার
আগেই,
দিদি
বলতে শুরু করেছে,
‘থাক
আর লুকোতে হবে না। এক-আধটা
খাবি,
এ
আর কী এমন কথা। তবে ওই এক-আধটাই,
তার
বেশি নয়’।
এইসব
বলেটলে ওর পাশে বসল পা ছড়িয়ে
দিব্যি। কী করে শৈবাল?
‘না
দিদি,
না,
তোমার
সামনে আমি কী করে…”,
শিবরঞ্জনী
বলে ওঠে,
‘আমায়
দে তাহলে,
দুটো
টান দিই দেখি’,
বলে
ওর হাত থেকে নিয়ে লম্বা টান
দিয়েই খক খক কাশি শুরু করে
দিয়েছে।
‘দাঁড়াও
জল আনি’,
বলে
শৈবাল নীচের দিকে দৌড়তে যাবে,
দেখে
মা ছাদে উঠে এসেছে,
হাতে
জলের জগটা।
‘কীরে,
কী
করছিস তোরা এখানে?
হিম
পড়ছে’।
শিবরঞ্জনী
বলে,
‘তুমি
যাও,
আমরা
যাচ্ছি এখুনি। দশ মিনিট’।
মা
নেমে যায়। শৈবাল নিজের সিগারেট
খুঁজতে শুরু করে,
শিবরঞ্জনী
ওকে বলে,
কাশির
দমকে তার হাত থেকে ওটা ছিটকে
নীচে গিয়ে পড়েছে।
শৈবাল
নিজের ঘর থেকে আরেকটা চুপিচুপি
এনে ধরায়। শিবরঞ্জনীও তাতে
দুটো টান দেয়। এবার কিছু হয়
না। সিগারেটটা শৈবালের হাতে
ফিরিয়ে দিতে গিয়ে ও বলে,
‘হ্যাঁরে
শৈবু,
মধুজা
কে?’
ঠিক
ধরতে পারে না সিগারেটটা শৈবাল,
পড়তে
পড়তে বাঁচে। যেন শুনতেই পায়নি
এমন ভঙ্গিতে শৈবাল বলে ওর কোন
এক বন্ধুর বোন নাকি গান শিখতে
চাইছে,
বন্ধুটি
ওকে জানিয়েছে সে কথা।
শিবরঞ্জনী
বুঝতে পারে ভাইয়ের বুদ্ধিদীপ্ত
পাশ কাটানো। আঁকড়ে বিষয়ে ফেরে
না ও। ছেড়ে দেয়। ভাইয়ের এই
পাকামি ভালোই লাগে ওর। জানিয়ে
দেয়,
গান
শেখাবে।
শৈবাল
ওর কথা বলে চলে। আজ ও তড়িৎ
স্যারের কাছে গেছিল,
বিজয়ার
প্রণাম করতে। তিনি একটা আঁকা
শুরু করেছেন। ভারি অদ্ভুত
লেগেছে সেটা শৈবালের। দুর্গাপুজোর
ভিড়ে সেদিন যেমন হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে
আসা বৃষ্টি,
তারপর
আস্তে হয়ে একেবারে থেমে যাওয়ার
মুহূর্তে একটি দুটি করে লোক
ছাউনির আশ্রয় থেকে রাস্তায়
বেরিয়ে আসছিল,
স্যার
অবিকল ওইরকম আঁকছে। একটা মেয়ের
মুখ মেন ফোকাসে,
তার
অবাক চাহনি,
সে
যেন চোখে চোখ রেখে চিনে ফেলেছে
কাউকে!
ছবিটায়
সব যেন স্পষ্ট চেনা,
অথচ
পুরোটা ঝাপসা। ঠাহর করেও কোথায়
যেন সব কিছুই দূরে দূরে। অবাক
শৈবাল স্যারকে ‘কীভাবে এমন
ঝাপসা করে দিচ্ছেন সব’ জিগেস
করাতে মুচকি হেসে স্যার বলেছে,
‘তুই
কী ভাবিস,
আঁকা
হয় শুধু তুলি দিয়ে?’
মনে
মনে খুব আশ্চর্য হয় শিবরঞ্জনী।
সেদিন সে তো ছিল ওদের বড় মাঠের
দুর্গাপুজোয়। দলবল মিলে
বসেছিল। বৃষ্টি নামল হঠাৎ।
সব যে যেদিকে পারে ছুটে গিয়ে
আশ্রয় নিল। বৃষ্টির বেগ কমে
এসে ধরতেই ও নিজেই প্রথম ফাঁকা
মাঠে নেমে এসেছিল,
ডাকাডাকি
শুরু করে দিয়েছিল কাবেরী,
জয়িতা,
সুরঙ্গমাদের।
শৈবালের তড়িৎস্যার কি ছিল
নাকি ওখানে?
দেখেছিল
নাকি ওকে?
কিন্তু
ওকে কি চিনবে সে?
এইসব
ভাবতে ভাবতে এবং কিছু যে ভাবছে
সেটা শৈবালের কাছে আড়াল করতে
করতে সেদিন ছাদ থেকে দশ মিনিটে
নামা হয়নি আর,
প্রায়
চল্লিশ মিনিট হয়ে গেছিল।
মফস্সল শহরে তখন বেশ রাত।
রাস্তার
আলো ঘেরা ভোঁ ভোঁ পোকা আর
শিবরঞ্জনীর ঘরের জানলা দিয়ে
দৃশ্যমান বড়মাঠে পুজোর
প্যান্ডেলের কাঠামো। কী একা
একা সব!
শিবরঞ্জনীর
ভারি ইচ্ছে হচ্ছিল ছবিটা
দেখতে।
ছয়
আজ
বিকেলের ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফিরে
সদ্য পড়তে আসা ছেলেগুলোকে
কিছু প্রশ্ন ধরিয়ে সেগুলোর
উত্তর লিখে রেখে চলে যেতে
বললেন তড়িৎকান্তি।
তড়িৎকান্তি
আজ শৈবালের বাড়ি যাবেন। সে
আসেছে না চারদিনের ওপর। কোনও
খবর নেই। ব্যাপারখানা দেখতে
হচ্ছে।
শিবনাথ
তখনো বাড়ি ফেরেননি। কমলিকা
চিনলেন না। তড়িৎকান্তি নিজ
পরিচয় প্রকাশ করতেই ‘আসুন
আসুন’ বলে শৈবালের ঘরে নিয়ে
এলেন তাঁকে,
‘দেখুন
না,
মাথায়
হিম বসে ঠান্ডা লেগেছে। সর্দি
জ্বর,
সঙ্গে
গা-হাত-মাথা
ব্যথা। আজ একটু নেমেছে জ্বর।
দুর্বল হয়ে পড়েছে খুব। আপনি
এখানে বসুন’,
শৈবালের
খাটের পাশে চেয়ার ইঙ্গিত করে
সে।
শৈবাল
একটু উঠে বসে,
হাসে,
‘স্যার…
আপনার আঁকাটা কতদূর হল?’
কমলিকার
সঙ্গে একজন কাজের মেয়ে আসে,
হাতে
একটি প্লেটে চারটে মিষ্টি,
কমলিকা
জলের গেলাসটা পাশে নামিয়ে
রেখে বলে,
‘খান,
আমি
চা নিয়ে আসছি’।
শিবরঞ্জনী
আগেই শুরু করেছিল সরগম,
ওপরের
ঘরে। এবার শুরু করল,
‘সেই
গান কেন আমি পারি না শোনাতে।’
তড়িৎকান্তি উৎসুক চোখে তাকায়
শৈবালের দিকে,
‘কে
গো!
তোমাদের
বাড়ি,
না
পাশের?’
শৈবাল
জানায় ওর দিদির গান গাওয়া,
গান
নিয়ে পড়াশুনো করা,
রেজাল্ট…
এইসব। শরীর একটু ঠিক হয়ে গেলেই
ও যাবে স্যারের কাছে… এইসব।
ওদের এ কথা ও কথার মাঝেই শিবরঞ্জনী
শুরু করে,
ঝরা
পাতা ঝড়কে ডাকে। স্যার অস্ফূটে
বলে ওঠে,
শিবরঞ্জনী।
চমকে যায় শৈবাল। স্যার তার
দিদির নাম জানল কী করে!
‘আপনি
চেনেন স্যার?’
অর্থপূর্ণ
নীরব হাসি তড়িৎকান্তির,
‘বাহ,
সে
কি আজকের কথা!’
বুঝতে
সময় লেগেছিল শৈবালের যে,
স্যার
রাগের কথা বলছেন,
আর
ও ওর দিদির। ভুলটা কয়েক দিন
পরে ভাঙিয়ে দিয়েছিল ওর দিদিই,
স্যারের
বাড়ি যাবার পথে,
রিকশায়
যেতে যেতে।
কমলিকা
শিবরঞ্জনীকে নিয়ে এসেছিলেন
তড়িৎকান্তির সঙ্গে পরিচয়
করাতে,
চায়ের
কাপ হাতে,
সেই
সন্ধেতেই। ওরা কেউ কাউকে আগে
দেখেনি তা নিশ্চিত বুঝেছিল
শৈবাল। কিন্তু আজ,
ঘটনার
প্রায় কুড়ি বছর বাদে,
ওর
মনে হয়,
সেই
সন্ধের আবহে কিছু একটা ছিল,
অলক্ষ্যে
কিছু আয়োজন চলছিল।
শিবরঞ্জনী
দুহাত জোড় করে নমস্কার করে
বলেছিল,
‘ভাইয়ের
থেকে শুনেছি,
আঁকাটা
আমি একদিন দেখতে যাব। ও একটু
সুস্থ হয়ে যাক।’
সাত
তড়িৎকান্তির
সঙ্গে পরিবারের কারও ঝামেলা
ঝগড়া কিছুমাত্র নেই। তবে কী,
ও
নিজের জগতেই মশগুল থাকতে চায়।
কিঞ্চিৎ যা কথাবার্তা
দরকারে-অদরকারে,
তা
হয় ওর মেজো তরফের বড়বউদির
সঙ্গেই। প্রায় সমবয়সীই হবে
বউদি।
তড়িৎকান্তি
আজ বউদিকে জানালেন,
তার
ছাত্রের এক দিদি,
‘ওই
যে শৈবাল,
ওর
দিদি,
আজ
বিকেলে আসবে,
আমার
আঁকাগুলো দেখতে। বউদি তুমি
একটু কিছু বানিও,
আমি
আর কী খেতে দিই বল।’
বউদি
মুখ টিপে হেসে বলল,
‘তা
বাপু,
তুমি
নিজেরটাই বা হাত পুড়িয়ে করতে
যাও কেন?
আমরা
কত্তবার বলেছি। তুমি কানে
তুললে না কোনওদিন।’
‘রোজের
ব্যাপার বাদ দাও বউদি। ও যা
চলছে ঠিক আছে। তুমি আজ বিকেলটা
একটু’,
তাকে
কথা শেষ না করতে দিয়েই বউদি
বলে,
‘তোমায়
ও নিয়ে কিচ্ছু ভাবতে হবে না।’
রিকশা
থেকে নামল যখন ওরা হেমন্তের
বেলা পড়ে এসেছে,
আলতো
রোদ এবার টুক করে মিলিয়ে যাবে।
শিবরঞ্জনী ছবি দেখল,
ভাই
যেটা বলেছিল সেটা,
আরও
অনেক। একটা বড় চামড়ার সুটকেস
খুলে সেখান থেকে অন্য আরও ছবি
বের করে দেখাচ্ছিলেন তড়িৎকান্তি।
বড়বউদি
এসে দাঁড়ায় তারপর। তড়িৎকান্তির
দিকে চেয়ে বলে,
‘ওফ
বন্ধ কর তো তোমার এসব’,
বলে
শিবরঞ্জনীর দিকে তাকায়,
বলে
ওঠে,
‘তুমি
এসো,
আমার
সঙ্গে ভিতরবাড়িতে চল,
ঘুরে
দেখাই।’
শৈবাল
ওর স্যারের কাছেই রয়ে যায়।
ছবিগুলো ও দেখেনি আগে সেভাবে।
অনেকগুলো ওইরকম অত্যুজ্জ্বল
অল্প ঝাপসা ছবি,
সিরিজের
মতো করে যেন এঁকেছেন স্যার।
ওর আর ওর স্যারের জন্য বাড়িতে
বানানো ফুলকপির শিঙাড়া এল
ভিতরবাড়ি থেকে।
ফেরার
পথে সামনের মোড় পর্যন্ত এগিয়ে
দিয়েছিলেন তড়িৎকান্তি,
শৈবালদের।
না ভুল হচ্ছে,
শিবরঞ্জনীদের।
রিকশাতে তার এতদিনের চেনা
দিদিকে কেমন অন্যরকম লাগছিল,
অন্যমনস্ক।
প্রখর আনন্দ আর চাপা উৎকণ্ঠা
সেখানে একই সঙ্গে ধরা দিচ্ছিল।
যেমন স্যারের ছবিগুলো দেখল
সদ্য।
আট
এ
গল্পের পরিণতিতে বিশেষ কোনও
চমক দেওয়ার নেই। শিবনাথ ও
কমলিকার তরফে আপত্তির জায়গাই
ছিল না,
তাই
তড়িৎকান্তি ও শিবরঞ্জনী সহজেই
বিবাহসূত্রে গ্রন্থিত হয়।
এর
বছর আটেক পরে শিবনাথ তাঁর অবসর
জীবন শুরুর তিন মাসের মাথায়
চলে যান পরপারে। বাড়িতে এখন
কমলিকা ও তাঁর পুত্র প্রবাল
থাকে।
তড়িৎকান্তি
ও শিবরঞ্জনী এক কন্যাসন্তানের
জন্ম দেন। তড়িৎকান্তি মুগুর
আর ভাঁজেন না,
তবে
তাঁর ছাত্র পড়ানো আজও অব্যাহত,
আরও
জনপ্রিয়ও হয়েছে।
এ
কাহিনীর আরেক মুখ্য চরিত্র,
শৈবালকে
নিয়ে কথক আর কিছু জানাতে আগ্রহী
নন।

Comments
Post a Comment